Monday, January 12, 2015

নক্সী কাঁথার মাঠ - তিন

- জসীমউদ্দীন


(তিন) 

ওই গাঁখানি কালো কালো, তারি হেলান দিয়ে, 
ঘরখানি যে দাঁড়িয়ে হাসে ছোনের ছানি নিয়ে ; 
সেইখানে এক চাষীর মেয়ে নামটি তাহার সোনা, 
সাজু বলেই ডাকে সবে, নাম নিতে যে গোনা | 
লাল মোরগের পাখার মত ওড়ে তাহার শাড়ী, 
ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ি | 
মুখখানি তার ঢলঢল ঢলেই যেত পড়ে, 
রাঙা ঠোঁটের লাল বাঁধনে না রাখলে তায় ধরে | 
ফুল-ঝর-ঝর জন্তি গাছে জড়িয়ে কেবা শাড়ী, 
আদর করে রেখেছে আজ চাষীদের ওই বাড়ি | 
যে ফুল ফোটে সোণের খেতে, ফোটে কদম গাছে, 
সকল ফুলের ঝলমল গা-ভরি তার নাচে | 

কচি কচি হাত পা সাজুর, সোনায় সোনার খেলা, 
তুলসী-তলায় প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা | 
গাঁদাফুলের রঙ দেখেছি, আর যে চাঁপার কলি, 
চাষী মেয়ের রূপ দেখে আজ তাই কেমনে বলি ? 
রামধনুকে না দেখিলে কি- বা ছিল ক্ষোভ, 
পাটের বনের বউ টুবাণী, নাইক দেখার লোভ | 
দেখেছি এই চাষী মেয়ের সহজ গেঁয়ো রূপ, 
তুলসী-ফুলের মঞ্জরী কি দেব-দেউলের ধূপ! 
দু একখানা গয়না গায়ে, সোনার দেবালয়ে, 
জ্বলছে সোনার পঞ্চ প্রদীপ কার বা পূজা বয়ে! 
পড়শীরা কয়---মেয়ে নয়, হলদে পাখির ছা, 
ডানা পেলেই পালিয়ে যেত ছেড়ে তাদের গাঁ | 

এমন মেয়ে---বাবা নেই, কেবল আছেন মা ; 
গাঁওবাসীরা তাই বলে তায় কম জানিত না | 
তাহার মতন চেরন 'সেওই' কে কাটিতে পারে, 
নক্সী করা পাকান পিঠায় সবাই তারে হারে | 
হাঁড়ির উপর চিত্র করা শিকেয় তোলা ফুল, 
এই গাঁয়েতে তাহার মত নাইক সমতুল | 
বিয়ের গানে ওরই সুরে সবারই সুর কাঁদে, 
'
সাজু গাঁয়ের লক্ষ্মী মেয়ে' --- বলে কি লোক সাধে?

0 comments :

Post a Comment