Showing posts with label বিশিষ্ট কবিদের জীবনি. Show all posts
Showing posts with label বিশিষ্ট কবিদের জীবনি. Show all posts

Wednesday, August 12, 2015

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়







সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
-------------------------------------------




সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
জন্ম    ১৯২৫
লক্ষ্ণৌ, উত্তরপ্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত
(বর্তমান ভারত)

মৃত্যু    ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯২
কলকাতা, ভারত

ধরন
আধুনিক, নজরুলগীতি, গজল

পেশা    সংগীত শিল্পী
--------------------------------------------------
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (১৯২৫ - ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯২) একজন খ্যাতিমান বাঙালি কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। [১] তিনি আধুনিক বাংলা গান, নজরুল সংগীত ও গজল শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পরিচ্ছেদসমূহ
•    ১ প্রথম জীবন
•    ২ সংগীত চর্চা
•    ৩ ব্যাক্তিগত জীবন
•    ৪ জনপ্রিয় গানসমূহ
•    ৫ মৃত্যু
•    ৬ আরও দেখুন
•    ৭ তথ্যসূত্র
•    ৮ বহিঃসংযোগ

প্রথম জীবন

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯২৫ সালে ভারতের লক্ষ্ণৌতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তারকচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। [২] পিতার চাকরিসূত্রে লক্ষ্ণৌতে জন্ম হলেও ছোটবেলাতেই সতীনাথ চলে আসেন হুগলির চুঁচুড়ায়। এখানেই তার বেড়ে ওঠা ও বিএ পর্যন্ত লেখাপড়া সম্পন্ন করেন। এরপর এমএ পড়ার জন্য কলকাতা আসেন।
ছোটবেলা থেকেই সতীনাথ সংগীতানুরাগী ছিলেন ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ধ্রুপদ-ধামার-টপ্পা শেখেন। তার ঠাকুরদা রামচন্দ্র বেহালা বাজাতেন ও বাবা তারকচন্দ্র গান গাইতেন। তবে কেউ পেশাদারি ছিলেন না। কলকাতায় এসে পড়া বাদ দিয়ে সতীনাথ চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা করেন। কর্মজীবনে যোগদান করেন কলকাতার অ্যাকাউন্টেন্স জেনারেল (এজি বেঙ্গল) এ।

ব্যাক্তিগত জীবন

১৯৬৮ সালে সতীনাথ সংগীত শিল্পী উৎপলা সেন এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
জনপ্রিয় গানসমূহ
•    আকাশ এত মেঘলা
•    জীবনে যদি দ্বীপ
•    মরমীয়া তুমি
•    পাষানের বুকে
•    ও আকাশ প্রদীপ
•    জানি একদিন
•    তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি
•    কত না হাজার ফুল
•    হায় বরষা
•    এখনো আকাশ
•    বন্ধু হয় অনেকে

মৃত্যু

১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় পিজি হাসপাতালে বক্ষ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেন।

---------------------------------------------------------

Mukherjee satinatha
Wikipedia, the free encyclopedia
---------------------------------------------------------
Mukherjee satinatha
Birth     1925
Lucknow , Uttar Pradesh , British India
(Now India )
Death     13 Dec 199
Kolkata , India
Style     Modern, Nazrul geeti , Ghazal
Profession     Music Artists
--------------------------------------------

Satinatha Mukherjee (1925 - 13 December 199) was a renowned Bengali singer, lyricist and music director was. [1] The modern Bengali songs, Nazrul was known as a painter of music and song.

Early

    1 Early Life
    The Music practice
    3 Private Life
    4 Popular ganasamuha
    5 dead
    6 See also
    7 References
    8 References

Early life

Satinatha Mukherjee, India, in 1925 at Lucknow was born. Mukherjee tarakacandra his father. [ii] father was born in Lucknow cakarisutre chotabelatei moved satinatha Chinsura Hooghly . It grew up and completed his education at the BA. He came to Calcutta to study MA.

From an early age he was sangitanuragi satinatha and classical music, classical-Fawn-tappa learned. Ramchandra his grandfather played the violin and sang songs tarakacandra parents. However, no one was professionalism. Kolkata satinatha Chinmoy Lahiri, with the exception of the study of the classical music. During his career, he joined the Calcutta ayakauntensa General (AG Bengal) in.
Music practice
Personal life

In 1968, singer satinatha Utpala Sen was married to.
Popular ganasamuha

    The sky is so cloudy
    If island life
    You maramiya
    Pasanera Chest
    Lamp and sky
    I know one day
    You are ever so nice
    Full of how
    Oh barasa
    Yet the sky
    Many friends

Death

1992 PG Hospital in Kolkata on December 13, satinatha Mukherjee died in breast diseases.

Monday, August 10, 2015

Kazi Nazrul Islam

Kazi Nazrul Islam was born on 25 May 1899 and died on 29 August 1976, moniker Bidrohi Kobi (Rebel Poet), known universally as Nazrul, was a Bengali poet, musician and innovative who forged poetic works adopting penetrating spiritual insurgence against fascism and persecution. Kazi Nazrul Islam‘s poetry and nationalist involvement received him the most popular title of “বিদ্রোহী কবি” Bidrohī Kobi (Rebel Poet). Accomplishing a great body of applauded works through his life; Kazi Nazrul Islam is authoritatively recognised as the national poet of Bangladesh and greatly commemorated in India.

Kazi Nazrul Islam born into a Bengali Muslim Quazi (Kazi) family, Nazrul acknowledged religious education and worked as a muezzin at a native mosque. Kazi Nazrul Islam learned of poetry, literature, and drama whereas working with theatrical groups. After serving in the British Indian Army, Nazrul recognized himself as a journalist in Calcutta. He stormed the British Raj in India and discoursed rebellion through his poetic works, such as “Bidrohi” (“The Rebel”) and “Bhangar Gaan” (“The Song of Destruction”), as well as his publication “Dhumketu” (“The Comet”). His passionate involvement in the Indian independence effort often led to his incarceration by British authorities. While Nazrul stayed in prison, Kazi Nazrul Islam wrote the “Rajbandir Jabanbandi” “রাজবন্দীর জবানবন্দী” (“Deposition of a Political Prisoner”). Reconnoitring the life and conditions of the browbeaten crowds of India, Nazrul worked for their liberation.

Nazrul’s writings discover themes such as love, freedom, and rebellion; he conflicting all prejudice, including religious and gender. Throughout his career, Kazi Nazrul Islam wrote short stories, novels, and essays but is best known for his poems, in which he established new forms such as Bengali ghazals. Kazi Nazrul Islam wrote and composed music for his nearly 4,000 songs (including gramophone records), cooperatively known as Nazrul geeti (Nazrul songs), which are extensively popular today. In 1942 at the age of 43 he began pain from an unknown sickness, dropping his voice and memory. It is frequently said, the cause was slow poisoning by British Government but later a medical team in Vienna identified the disease as Morbus Pick, an erratic irredeemable neurodegenerative disease. It caused Nazrul’s health to weakening progressively and forced him to live in segregation for many years. Invited by the Government of Bangladesh, Nazrul and his family moved to Dhaka in 1972, where he died four years later.

Nazrul’s poetry is categorized by a plentiful use of bombastic devices, which Kazi Nazrul Islam employed to take opinion and sensuousness. He frequently wrote without maintenance for organisation or polish. His works have often been assessed for egotism, but his devotees counter that they transmit more a sense of self-confidence than ego. They cite his capability to rebel God yet preserve an innermost, modest dedication to Him. Nazrul’s poetry is observed as craggy but unique in contrast to Tagore’s erudite style. Kazi Nazrul Islam‘s use of Persian vocabulary was contentious but it broadened the possibility of his work. Nazrul’s works for children have won commendation for his use of gorgeous language, imagination, enthusiasm and a capability to captivate young readers.

Kazi Nazrul Islam is considered for his secularism. He was the first person to quote of Christians of Bengal in his novel Mrityukhudha. He was also the first manipulator of folk terms in Bengali literature. He first printed the Sickle and Hammer in any Indian magazine. Kazi Nazrul Islam established new styles and articulated fundamental ideas and emotions in a hefty body of work. Scholars credit him for fronting a cultural revitalization in Muslim-majority Bengal, “liberating” poetry and literature in Bengali from its primitive pattern. Kazi Nazrul Islam was endowed the Jagattarini Gold Medal in 1945 — the highest honour for work in Bengali literature by the University of Calcutta — and endowed the Padma Bhushan, one of India’s highest civilian honours in 1960. The Government of Bangladesh consulted upon him the status of being the “national poet”. He was endowed the Ekushey Padak by the Government of Bangladesh. He was endowed Honorary D.Litt. by the University of Dhaka. Many centres of learning and culture in India and Bangladesh have been established and devoted to his memory. The Kazi Nazrul Islam Benefaction is one of numerous scholarly institutions established to reservation and explains upon his thoughts and philosophy, as well as the conservation and analysis of the big and varied collection of his works. The Bangladesh Nazrul Sena is a large public organization working for the education of children throughout the country.



Source: Wikipedia

Friday, February 27, 2015

সিন্ধুপারে


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পউষ প্রখর শীতে জর্জর, ঝিল্লিমুখর রাতি;
নিদ্রিত পুরী, নির্জন ঘর, নির্বাণদীপ বাতি।
অকাতর দেহে আছিনু মগন সুখনিদ্রার ঘোরে--
তপ্ত শয্যা প্রিয়ার মতন সোহাগে ঘিরেছে মোরে।
হেনকালে হায় বাহির হইতে কে ডাকিল মোর নাম--
নিদ্রা টুটিয়া সহসা চকিতে চমকিয়া বসিলাম।
তীক্ষ্ণ শাণিত তীরের মতন মর্মে বাজিল স্বর--
ঘর্ম বহিল ললাট বাহিয়া, রোমাঞ্চকলেবর।
ফেলি আবরণ, ত্যজিয়া শয়ন, বিরলসন বেশে
দুরু দুরু বুকে খুলিয়া দুয়ার বাহিরে দাঁড়ানু এসে।
দূর নদীপারে শূন্য শ্মশানে শৃগাল উঠিল ডাকি,
মাথার উপরে কেঁদে উড়ে গেল কোন্ নিশাচর পাখি।
দেখিনু দুয়ারে রমণীমুরতি অবগুণ্ঠনে ঢাকা--
কৃষ্ণ অশ্বে বসিয়া রয়েছে, চিত্রে যেন সে আঁকা।
আরেক অশ্ব দাঁড়ায়ে রয়েছে, পুচ্ছ ভূতল চুমে,
ধূম্রবরন, যেন দেহ তার গঠিত শ্মশানধূমে।
নড়িল না কিছু, আমারে কেবল হেরিল আঁখির পাশে--
শিহরি শিহরি সর্ব শরীর কাঁপিয়া উঠিল ত্রাসে।
পাণ্ডু আকাশে খণ্ড চন্দ্র হিমানীর গ্লানি-মাখা,
পল্লবহীন বৃদ্ধ অশথ শিহরে নগ্ন শাখা।
নীরব রমণী অঙ্গুলী তুলি দিল ইঙ্গিত করি--
মন্ত্রমুগ্ধ অচেতনসম চড়িনু অশ্ব-'পরি।


বিদ্যুৎবেগে ছুটে যায় ঘোড়া-- বারেক চাহিনু পিছে,
ঘরদ্বার মোর বাষ্পসমান মনে হল সব মিছে।
কাতর রোদন জাগিয়া উঠিল সকল হৃদয় ব্যেপে,
কণ্ঠের কাছে সুকঠিন বলে কে তারে ধরিল চেপে।
পথের দুধারে রুদ্ধদুয়ারে দাঁড়ায়ে সৌধসারি,
ঘরে ঘরে হায় সুখশয্যায় ঘুমাইছে নরনারী।
নির্জন পথ চিত্রিতবৎ, সাড়া নাই সারা দেশে--
রাজার দুয়ারে দুইটি প্রহরী ঢুলিছে নিদ্রাবেশে।
শুধু থেকে থেকে ডাকিছে কুকুর সুদূর পথের মাঝে--
গম্ভীর স্বরে প্রাসাদশিখরে প্রহরঘন্টা বাজে।


অফুরান পথ, অফুরান রাতি, অজানা নূতন ঠাঁই--
অপরূপ এক স্বপ্নসমান, অর্থ কিছুই নাই।
কী যে দেখেছিনু মনে নাহি পড়ে, ছিল নাকো আগাগোড়া--
লক্ষ্যবিহীন তীরের মতন ছুটিয়া চলেছে ঘোড়া।
চরণে তাদের শব্দ বাজে না, উড়ে নাকো ধূলিরেখা--
কঠিন ভূতল নাই যেন কোথা, সকলি বাষ্পে লেখা।
মাঝে মাঝে যেন চেনা-চেনা-মতো মনে হয় থেকে থেকে--
নিমেষ ফেলিতে দেখিতে না পাই কোথা পথ যায় বেঁকে।
মনে হল মেঘ, মনে হল পাখি, মনে হল কিশলয়,
ভালো করে যেই দেখিবারে যাই মনে হল কিছু নয়।
দুই ধারে এ কি প্রাসাদের সারি? অথবা তরুর মূল?
অথবা এ শুধু আকাশ জুড়িয়া আমারই মনের ভুল?
মাঝে মাঝে চেয়ে দেখি রমণীর অবগুণ্ঠিত মুখে--
নীরব নিদয় বসিয়া রয়েছে, প্রাণ কেঁপে ওঠে বুকে।
ভয়ে ভুলে যাই দেবতার নাম, মুখে কথা নাহি ফুটে;
হুহু রবে বায়ু বাজে দুই কানে ঘোড়া চলে যায় ছুটে।


চন্দ্র যখন অস্তে নামিল তখনো রয়েছে রাতি,
পূর্ব দিকের অলস নয়নে মেলিছে রক্ত ভাতি।
জনহীন এক সিন্ধুপুলিনে অশ্ব থামিল আসি--
সমুখে দাঁড়ায়ে কৃষ্ণ শৈল গুহামুখ পরকাশি।
সাগরে না শুনি জলকলরব, না গাহে উষার পাখি,
বহিল না মৃদু প্রভাতপবন বনের গন্ধ মাখি।
অশ্ব হইতে নামিল রমণী, আমিও নামিনু নীচে,
আঁধার-ব্যাদান গুহার মাঝারে চলিনু তাহার পিছে।
ভিতরে খোদিত উদার প্রাসাদ শিলাস্তম্ভ-'পরে,
কনকশিকলে সোনার প্রদীপ দুলিতেছে থরে থরে।
ভিত্তির গায়ে পাষাণমূর্তি চিত্রিত আছে কত,
অপরূপ পাখি, অপরূপ নারী, লতাপাতা নানা-মতো।
মাঝখানে আছে চাঁদোয়া খাটানো, মুক্তা ঝালরে গাঁথা--
তারি তলে মণিপালঙ্ক-'পরে অমল শয়ন পাতা।
তারি দুই ধারে ধূপাধার হতে উঠিছে গন্ধধূপ,
সিংহবাহিনী নারীর প্রতিমা দুই পাশে অপরূপ।
নাহি কোনো লোক, নাহিকো প্রহরী, নাহি হেরি দাসদাসী।
গুহাগৃহতলে তিলেক শব্দ হয়ে উঠে রাশি রাশি।
নীরবে রমণী আবৃত বদনে বসিলা শয্যা-'পরে,
অঙ্গুলি তুলি ইঙ্গিত করি পাশে বসাইল মোরে।
হিম হয়ে এল সর্বশরীর, শিহরি উঠিল প্রাণ--
শোণিতপ্রবাহে ধ্বনিতে লাগিল ভয়ের ভীষণ তান।


সহসা বাজিয়া বাজিয়া উঠিল দশ দিকে বীণা-বেণু,
মাথার উপরে ঝরিয়া ঝরিয়া পড়িল পুষ্পরেণু।
দ্বিগুণ আভায় জ্বলিয়া উঠিল দীপের আলোকরাশি--
ঘোমটা-ভিতরে হাসিল রমণী মধুর উচ্চহাসি।
সে হাসি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া উঠিল বিজন বিপুল ঘরে--
শুনিয়া চমকি ব্যাকুল হৃদয়ে কহিলাম জোড়করে,
"আমি যে বিদেশী অতিথি, আমায় ব্যথিয়ো না পরিহাসে,
কে তুমি নিদয় নীরব ললনা, কোথায় আনিলে দাসে।'


অমনি রমণী কনকদণ্ড আঘাত করিল ভূমে,
আঁধার হইয়া গেল সে ভবন রাশি রাশি ধূপধূমে।
বাজিয়া উঠিল শতেক শঙ্খ হুলুকলরব-সাথে--
প্রবেশ করিল বৃদ্ধ বিপ্র ধান্যদূর্বা হাতে।
পশ্চাতে তার বাঁধি দুই সার কিরাতনারীর দল
কেহ বহে মালা, কেহ বা চামর, কেহ বা তীর্থজল।
নীরবে সকলে দাঁড়ায়ে রহিল-- বৃদ্ধ আসনে বসি
নীরবে গণনা করিতে লাগিল গৃহতলে খড়ি কষি।
আঁকিতে লাগিল কত না চক্র, কত না রেখার জাল,
গণনার শেষে কহিল "এখন হয়েছে লগ্ন-কাল'।
শয়ন ছাড়িয়া উঠিল রমণী বদন করিয়া নত,
আমিও উঠিয়া দাঁড়াইনু পাশে মন্ত্রচালিতমত।
নারীগণ সবে ঘেরিয়া দাঁড়ালো একটি কথা না বলি
দোঁহাকার মাথে ফুলদল-সাথে বরষি লাজাঞ্জলি।
পুরোহিত শুধু মন্ত্র পড়িল আশিস করিয়া দোঁহে--
কী ভাষা কী কথা কিছু না বুঝিনু, দাঁড়ায়ে রহিনু মোহে।
অজানিত বধূ নীরবে সঁপিল শিহরিয়া কলেবর
হিমের মতন মোর করে তার তপ্ত কোমল কর।
চলি গেল ধীরে বৃদ্ধ বিপ্র, পশ্চাতে বাঁধি সার
গেল নারীদল মাথায় কক্ষে মঙ্গল-উপচার।
শুধু এক সখী দেখাইল পথ হাতে লয়ে দীপখানি--
মোরা দোঁহে পিছে চলিনু তাহার, কারো মুখে নাহি বাণী।
কত না দীর্ঘ আঁধার কক্ষ সভয়ে হইয়া পার
সহসা দেখিনু সমুখে কোথায় খুলে গেল এক দ্বার।
কী দেখিনু ঘরে কেমনে কহিব, হয়ে যায় মনোভুল,
নানা বরনের আলোক সেথায়, নানা বরনের ফুল।
কনকে রজতে রতনে জড়িত বসন বিছানো কত,
মণিবেদিকায় কুসুমশয়ন স্বপ্নরচিত-মতো।
পাদপীঠ-'পরে চরণ প্রসারি শয়নে বসিলা বধূ--
আমি কহিলাম, "সব দেখিলাম, তোমারে দেখি নি শুধু।'


চারি দিক হতে বাজিয়া উঠিল শত কৌতুকহাসি।
শত ফোয়ারায় উছসিল যেন পরিহাস রাশি রাশি।
সুধীরে রমণী দু-বাহু তুলিয়া, অবগুণ্ঠনখানি
উঠায়ে ধরিয়া মধুর হাসিল মুখে না কহিয়া বাণী।
চকিত নয়ানে হেরি মুখপানে পড়িনু চরণতলে,
"এখানেও তুমি জীবনদেবতা!' কহিনু নয়নজলে।
সেই মধুমুখ, সেই মৃদুহাসি, সেই সুধাভরা আঁখি--
চিরদিন মোরে হাসালো কাঁদালো, চিরদিন দিল ফাঁকি।
খেলা করিয়াছে নিশিদিন মোর সব সুখে সব দুখে,
এ অজানাপুরে দেখা দিল পুন সেই পরিচিত মুখে।
অমল কোমল চরণকমলে চুমিনু বেদনাভরে--
বাধা না মানিয়া ব্যাকুল অশ্রু পড়িতে লাগিল ঝরে।
অপরূপ তানে ব্যথা দিয়ে প্রাণে বাজিতে লাগিল বাঁশি।

বিজন বিপুল ভবনে রমণী হাসিতে লাগিল হাসি।

Wednesday, February 4, 2015

আর দেখা হবে না

আর দেখা হবে না
যানি আর কোন দিন দেখা হবেনা
হারানো সে দিন আর ফিরে পাবনা।
যানি আর কোন দিন দেখা হবেনা

দিন চলে যায় রোদেলা মায়ায়
রাতেরো আকাশ কাঁদে তারায় তারায়
ছায়া পথে আলো নেই চাঁদে নেই কোন জোছোনা।

দেখা হবে না
যানি আর কোন দিন দেখা হবেনা
হারানো সে দিন আর ফিরে পাবনা।
যানি আর কোন দিন দেখা হবেনা

এভাবে সানাই সুধু বোলে যায় সে চলে যায় চলে যায়।
আমিতো আমাতে নেই তুমি মিছে ভুল করোনা।

যানি আর কোন দিন দেখা হবেনা
হারানো সে দিন আর ফিরে পাবনা।

যানি আর কোন দিন দেখা হবেনা

Tuesday, February 3, 2015

প্রথম সর্গ


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শুন কলপনা বালা, ছিল কোন কবি 
বিজন কুটীর-তলে। ছেলেবেলা হোতে 
তোমার অমৃত-পানে আছিল মজিয়া। 
তোমার বীণার ধ্বনি ঘুমায়ে ঘুমায়ে 
শুনিত, দেখিত কত সুখের স্বপন। 
একাকী আপন মনে সরল শিশুটি 
তোমারি কমল-বনে করিত গো খেলা, 
মনের কত কি গান গাহিত হরষে, 
বনের কত কি ফুলে গাঁথিত মালিকা। 
একাকী আপন মনে কাননে কাননে 
যেখানে সেখানে শিশু করিত ভ্রমণ; 
একাকী আপন মনে হাসিত কাঁদিত। 
জননীর কোল হতে পালাত ছুটিয়া, 
প্রকৃতির কোলে গিয়া করিত সে খেলা-- 
ধরিত সে প্রজাপতি, তুলিত সে ফুল, 
বসিত সে তরুতলে, শিশিরের ধারা 
ধীরে ধীরে দেহে তার পড়িত ঝরিয়া। 
বিজন কুলায়ে বসি গাহিত বিহঙ্গ, 
হেথা হোথা উঁকি মারি দেখিত বালক 
কোথায় গাইছে পাখী। ফুলদলগুলি, 
কামিনীর গাছ হোতে পড়িলে ঝরিয়া 
ছড়ায়ে ছড়ায়ে তাহা করিত কি খেলা! 
প্রফুল্ল উষার ভূষা অরুণকিরণে 
বিমল সরসী যবে হোত তারাময়ী, 
ধরিতে কিরণগুলি হইত অধীর। 
যখনি গো নিশীথের শিশিরাশ্রু-জলে 
ফেলিতেন উষাদেবী সুরভি নিশ্বাস, 
গাছপালা লতিকার পাতা নড়াইয়া 
ঘুম ভাঙাইয়া দিয়া ঘুমন্ত নদীর 
যখনি গাহিত বায়ু বন্য-গান তার, 
তখনি বালক-কবি ছুটিত প্রান্তরে, 
দেখিত ধান্যের শিষ দুলিছে পবনে। 
দেখিত একাকী বসি গাছের তলায়, 
স্বর্ণময় জলদের সোপানে সোপানে 
উঠিছেন উষাদেবী হাসিয়া হাসিয়া। 
নিশা তারে ঝিল্লীরবে পাড়াইত ঘুম, 
পূর্ণিমার চাঁদ তার মুখের উপরে 
তরল জোছনা-ধারা দিতেন ঢালিয়া, 
স্নেহময়ী মাতা যথা সুপ্ত শিশুটির 
মুখপানে চেয়ে চেয়ে করেন চুম্বন। 
প্রভাতের সমীরণে, বিহঙ্গের গানে 
উষা তার সুখনিদ্রা দিতেন ভাঙ্গায়ে। 
এইরূপে কি একটি সঙ্গীতের মত, 
তপনের স্বর্ণময়-কিরণে প্লাবিত 
প্রভাতের একখানি মেঘের মতন, 
নন্দন বনের কোন অপ্সরা-বালার 
সুখময় ঘুমঘোরে স্বপনের মত 
কবির বালক-কাল হইল বিগত। 
                 -- 
যৌবনে যখনি কবি করিল প্রবেশ, 
প্রকৃতির গীতধ্বনি পাইল শুনিতে, 
বুঝিল সে প্রকৃতির নীরব কবিতা। 
প্রকৃতি আছিল তার সঙ্গিনীর মত। 
নিজের মনের কথা যত কিছু ছিল 
কহিত প্রকৃতিদেবী তার কানে কানে, 
প্রভাতের সমীরণ যথা চুপিচুপি 
কহে কুসুমের কানে মরমবারতা। 
নদীর মনের গান বালক যেমন 
বুঝিত, এমন আর কেহ বুঝিত না। 
বিহঙ্গ তাহার কাছে গাইত যেমন, 
এমন কাহারো কাছে গাইত না আর। 
তার কাছে সমীরণ যেমন বহিত 
এমন কাহারো কাছে বহিত না আর। 
যখনি রজনীমুখ উজলিত শশী, 
সুপ্ত বালিকার মত যখন বসুধা 
সুখের স্বপন দেখি হাসিত নীরবে, 
বসিয়া তটিনীতীরে দেখিত সে কবি-- 
স্নান করি জোছনায় উপরে হাসিছে 
সুনীল আকাশ, হাসে নিম্নে স্রোতস্বিনী; 
সহসা সমীরণের পাইয়া পরশ 
দুয়েকটি ঢেউ কভু জাগিয়া উঠিছে। 
ভাবিত নদীর পানে চাহিয়া চাহিয়া, 
নিশাই কবিতা আর দিবাই বিজ্ঞান। 
দিবসের আলোকে সকলি অনাবৃত, 
সকলি রয়েছে খোলা চখের সমুখে-- 
ফুলের প্রত্যেক কাঁটা পাইবে দেখিতে। 
দিবালোকে চাও যদি বনভূমি-পানে, 
কাঁটা খোঁচা কর্দ্দমাক্ত বীভৎস জঙ্গল 
তোমার চখের 'পরে হবে প্রকাশিত; 
দিবালোকে মনে হয় সমস্ত জগৎ 
নিয়মের যন্ত্রচক্রে ঘুরিছে ঘর্ঘরি। 
কিন্তু কবি নিশাদেবী কি মোহন-মন্ত্র 
পড়ি দেয় সমুদয় জগতের 'পরে, 
সকলি দেখায় যেন স্বপ্নের মতন; 
ঐ স্তব্ধ নদীজলে চন্দ্রের আলোকে 
পিছলিয়া চলিতেছে যেমন তরণী, 
তেমনি সুনীল ঐ আকাশসলিলে 
ভাসিয়া চলেছে যেন সমস্ত জগৎ; 
সমস্ত ধরারে যেন দেখিয়া নিদ্রিত, 
একাকী গম্ভীর-কবি নিশাদেবী ধীরে 
তারকার ফুলমালা জড়ায়ে মাথায়, 
জগতের গ্রন্থ কত লিখিছে কবিতা। 
এইরূপে সেই কবি ভাবিত কত কি। 
হৃদয় হইল তার সমুদ্রের মত, 
সে সমুদ্রে চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারকার 
প্রতিবিম্ব দিবানিশি পড়িত খেলিত, 
সে সমুদ্র প্রণয়ের জোছনা-পরশে 
লঙ্ঘিয়া তীরের সীমা উঠিত উথলি, 
সে সমুদ্র আছিল গো এমন বিস্তৃত 
সমস্ত পৃথিবীদেবী, পারিত বেষ্টিতে 
নিজ স্নিগ্ধ আলিঙ্গনে। সে সিন্ধু-হৃদয়ে 
দুরন্ত শিশুর মত মুক্ত সমীরণ 
হু হু করি দিবানিশি বেড়াত খেলিয়া। 
নির্ঝরিণী, সিন্ধুবেলা, পর্ব্বতগহ্বর, 
সকলি কবির ছিল সাধের বসতি। 
তার প্রতি তুমি এত ছিলে অনুকূল 
কল্পনা! সকল ঠাঁই পাইত শুনিতে 
তোমার বীণার ধ্বনি, কখনো শুনিত 
প্রস্ফুটিত গোলাপের হৃদয়ে বসিয়া 
বীণা লয়ে বাজাইছ অস্ফুট কি গান। 
কনককিরণময় উষার জলদে 
একাকী পাখীর সাথে গাইতে কি গীত 
তাই শুনি যেন তার ভাঙ্গিত গো ঘুম! 
অনন্ত-তারা-খচিত নিশীথগগনে 
বসিয়া গাইতে তুমি কি গম্ভীর গান, 
তাহাই শুনিয়া যেন বিহ্বলহৃদয়ে 
নীরবে নিশীথে যবে একাকী রাখাল 
সুদূর কুটীরতলে বাজাইত বাঁশী 
তুমিও তাহার সাথে মিলাইতে ধ্বনি, 
সে ধ্বনি পশিত তার প্রাণের ভিতর। 
নিশার আঁধার-কোলে জগৎ যখন 
দিবসের পরিশ্রমে পড়িত ঘুমায়ে 
তখন সে কবি উঠি তুষারমন্ডিত 
সমুচ্চ পর্ব্বতশিরে গাইত একাকী 
প্রকৃতিবন্দনাগান মেঘের মাঝারে। 
সে গম্ভীর গান তার কেহ শুনিত না, 
কেবল আকাশব্যাপী স্তব্ধ তারকারা 
এক দৃষ্টে মুখপানে রহিত চাহিয়া। 
কেবল, পর্ব্বতশৃঙ্গ করিয়া আঁধার, 
সরল পাদপরাজি নিস্তব্ধ গম্ভীর 
ধীরে ধীরে শুনিত গো তাহার সে গান; 
কেবল সুদূর বনে দিগন্তবালায় 
হৃদয়ে সে গান পশি প্রতিধ্বনিরূপে 
মৃদুতর হোয়ে পুন আসিত ফিরিয়া। 
কেবল সুদূর শৃঙ্গে নির্ঝরিণী বালা 
সে গম্ভীর গীতি-সাথে কণ্ঠ মিশাইত, 
নীরবে তটিনী যেত সমুখে বহিয়া, 
নীরবে নিশীথবায়ু কাঁপাত পল্লব। 
গম্ভীরে গাইত কবি--"হে মহাপ্রকৃতি, 
কি সুন্দর, কি মহান্‌ মুখশ্রী তোমার, 
শূন্য আকাশের পটে হে প্রকৃতিদেবি 
কি কবিতা লিখেছে যে জ্বলন্ত অক্ষরে, 
যত দিন রবে প্রাণ পড়িয়া পড়িয়া 
তবু ফুরাবে না পড়া; মিটিবে না আশ! 
শত শত গ্রহ তারা তোমার কটাক্ষে 
কাঁপি উঠে থরথরি, তোমার নিশ্বাসে 
ঝটিকা বহিয়া যায় বিশ্বচরাচরে। 
কালের মহান্‌ পক্ষ করিয়া বিস্তার, 
অনন্ত আকাশে থাকি হে আদি জননি, 
শাবকের মত এই অসংখ্য জগৎ 
তোমার পাখার ছায়ে করিছ পালন! 
সমস্ত জগৎ যবে আছিল বালক, 
দুরন্ত শিশুর মত অনন্ত আকাশে 
করিত গো ছুটাছুটি না মানি শাসন, 
স্তনদানে পুষ্ট করি তুমি তাহাদের 
অলঙ্ঘ্য সখ্যের ডোরে দিলে গো বাঁধিয়া। 
এ দৃঢ় বন্ধন যদি ছিঁড়ে একবার, 
সে কি ভয়ানক কাণ্ড বাঁধে এ জগতে, 
কক্ষচ্ছিন্ন কোটি কোটি সূর্য্য চন্দ্র তারা 
অনন্ত আকাশময় বেড়ায় মাতিয়া, 
মণ্ডলে মণ্ডলে ঠেকি লক্ষ সূর্য্য গ্রহ 
চূর্ণ চূর্ণ হোয়ে পড়ে হেথায় হোথায়; 
এ মহান্‌ জগতের ভগ্ন অবশেষ 
চূর্ণ নক্ষত্রের স্তূপ, খণ্ড খণ্ড গ্রহ 
বিশৃঙ্খল হোয়ে রহে অনন্ত আকাশে! 
অনন্ত আকাশ আর অনন্ত সময়, 
যা ভাবিতে পৃথিবীর কীট মানুষের 
ক্ষুদ্র বুদ্ধি হোয়ে পড়ে ভয়ে সঙ্কুচিত, 
তাহাই তোমার দেবি সাধের আবাস। 
তোমার মুখের পানে চাহিতে হে দেবি 
ক্ষুদ্র মানবের এই স্পর্ধিত জ্ঞানের 
দুর্ব্বল নয়ন যায় নিমীলিত হোয়ে। 
হে জননি আমার এ হৃদয়ের মাঝে 
অনন্ত-অতৃপ্তি-তৃষ্ণা জ্বলিছে সদাই, 
তাই দেবি পৃথিবীর পরিমিত কিছু 
পারে না গো জুড়াইতে হৃদয় আমার, 
তাই ভাবিয়াছি আমি হে মহাপ্রকৃতি, 
মজিয়া তোমার সাথে অনন্ত প্রণয়ে 
জুড়াইব হৃদয়ের অনন্ত পিপাসা! 
প্রকৃতি জননি ওগো, তোমার স্বরূপ 
যত দূর জানিবারে ক্ষুদ্র মানবেরে 
দিয়াছ গো অধিকার সদয় হইয়া, 
তত দূর জানিবারে জীবন আমার 
করেছি ক্ষেপণ আর করিব ক্ষেপণ। 
ভ্রমিতেছি পৃথিবীর কাননে কাননে-- 
বিহঙ্গও যত দূর পারে না উড়িতে 
সে পর্ব্বতশিখরেও গিয়াছি একাকী; 
দিবাও পশে নি দেবি যে গিরিগহ্বরে, 
সেথায় নির্ভয়ে আমি করেছি প্রবেশ। 
যখন ঝটিকা ঝঞ্ঝা প্রচণ্ড সংগ্রামে 
অটল পর্ব্বতচূড়া করেছে কম্পিত, 
সুগম্ভীর অম্বুনিধি উন্মাদের মত 
করিয়াছে ছুটাছুটি যাহার প্রতাপে, 
তখন একাকী আমি পর্ব্বত-শিখরে 
দাঁড়াইয়া দেখিয়াছি সে ঘোর বিপ্লব, 
মাথার উপর দিয়া অজস্র অশনি 
সুবিকট অট্টহাসে গিয়াছে ছুটিয়া, 
প্রকাণ্ড শিলার স্তূপ পদতল হোতে 
পড়িয়াছে ঘর্ঘরিয়া উপত্যকা-দেশে, 
তুষারসঙ্ঘাতরাশি পড়েছে খসিয়া 
শৃঙ্গ হোতে শৃঙ্গান্তরে উলটি পালটি। 
অমানিশীথের কালে নীরব প্রান্তরে 
বসিয়াছি, দেখিয়াছি চৌদিকে চাহিয়া, 
সর্ব্বব্যাপী নিশীথের অন্ধকার গর্ভে 
এখনো পৃথিবী যেন হতেছে সৃজিত। 
স্বর্গের সহস্র আঁখি পৃথিবীর 'পরে 
নীরবে রয়েছে চাহি পলকবিহীন, 
স্নেহময়ী জননীর স্নেহ-আঁখি যথা 
সুপ্ত বালকের পরে রহে বিকসিত। 
এমন নীরবে বায়ু যেতেছে বহিয়া, 
নীরবতা ঝাঁ ঝাঁ করি গাইছে কি গান-- 
মনে হয় স্তব্ধতার ঘুম পাড়াইছে। 
কি সুন্দর রূপ তুমি দিয়াছ উষায়, 
হাসি হাসি নিদ্রোত্থিতা বালিকার মত 
আধঘুমে মুকুলিত হাসিমাখা আঁখি! 
কি মন্ত্র শিখায়ে দেছ দক্ষিণ-বালারে-- 
যে দিকে দক্ষিণবধূ ফেলেন নিঃশ্বাস, 
সে দিকে ফুটিয়া উঠে কুসুম-মঞ্জরী, 
সে দিকে গাহিয়া উঠে বিহঙ্গের দল, 
সে দিকে বসন্ত-লক্ষ্মী উঠেন হাসিয়া। 
কি হাসি হাসিতে জানে পূর্ণিমাশর্ব্বরী-- 
সে হাসি দেখিয়া হাসে গম্ভীর পর্ব্বত, 
সে হাসি দেখিয়া হাসে উথল জলধি, 
সে হাসি দেখিয়া হাসে দরিদ্র কুটীর। 
হে প্রকৃতিদেবি তুমি মানুষের মন 
কেমন বিচিত্র ভাবে রেখেছ পূরিয়া, 
করুণা, প্রণয়, স্নেহ, সুন্দর শোভন-- 
ন্যায়, ভক্তি, ধৈর্য্য আদি সমুচ্চ মহান্‌-- 
ক্রোধ, দ্বেষ, হিংসা আদি ভয়ানক ভাব, 
নিরাশা মরুর মত দারুণ বিষণ্ণ-- 
তেমনি আবার এই বাহির জগৎ 
বিচিত্র বেশভূষায় করেছ সজ্জিত। 
তোমার বিচিত্র কাব্য-উপবন হোতে 
তুলিয়া সুরভি ফুল গাঁথিয়া মালিকা, 
তোমারি চরণতলে দিব উপহার!" 
এইরূপে সুনিস্তব্ধ নিশীথ-গগনে 
প্রকৃতি-বন্দনা-গান গাইত সে কবি।