Showing posts with label বিশিষ্ট কবিদের কবিতা. Show all posts
Showing posts with label বিশিষ্ট কবিদের কবিতা. Show all posts

Thursday, August 27, 2015

সবার আমি ছাত্র

সুনির্মল বসু


সবার আমি ছাত্র
সুনির্মল বসু
আকাশ আমায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাই রে,
কর্মী হবার মন্ত্র আমি
বায়ুর কাছে পাই রে।
পাহাড় শিখায় তাহার সমান-
হই যেন ভাই মৌন-মহান,
খোলা মাঠের উপদেশে-
দিল-খোলা হই তাই রে।
সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়
আপন তেজে জ্বলতে,
চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে,
মধুর কথা বলতে।
ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর-
অন্তর হোক রত্ন-আকর;
নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম
আপন বেগে চলতে।
মাটির কাছে সহিষ্ণুতা
পেলাম আমি শিক্ষা,
আপন কাজে কঠোর হতে
পাষান দিল দীক্ষা।
ঝরনা তাহার সহজ গানে,
গান জাগাল আমার প্রাণে;
শ্যাম বনানী সরসতা
আমায় দিল ভিক্ষা।
বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,
সবার আমি ছাত্র,
নানান ভাবে নতুন জিনিস
শিখছি দিবারাত্র।
এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়,
পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়
শিখছি সে সব কৌতূহলে,
নেই দ্বিধা লেশমাত্র।

Wednesday, August 12, 2015

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়







সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
-------------------------------------------




সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
জন্ম    ১৯২৫
লক্ষ্ণৌ, উত্তরপ্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত
(বর্তমান ভারত)

মৃত্যু    ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯২
কলকাতা, ভারত

ধরন
আধুনিক, নজরুলগীতি, গজল

পেশা    সংগীত শিল্পী
--------------------------------------------------
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (১৯২৫ - ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯২) একজন খ্যাতিমান বাঙালি কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। [১] তিনি আধুনিক বাংলা গান, নজরুল সংগীত ও গজল শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পরিচ্ছেদসমূহ
•    ১ প্রথম জীবন
•    ২ সংগীত চর্চা
•    ৩ ব্যাক্তিগত জীবন
•    ৪ জনপ্রিয় গানসমূহ
•    ৫ মৃত্যু
•    ৬ আরও দেখুন
•    ৭ তথ্যসূত্র
•    ৮ বহিঃসংযোগ

প্রথম জীবন

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯২৫ সালে ভারতের লক্ষ্ণৌতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তারকচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। [২] পিতার চাকরিসূত্রে লক্ষ্ণৌতে জন্ম হলেও ছোটবেলাতেই সতীনাথ চলে আসেন হুগলির চুঁচুড়ায়। এখানেই তার বেড়ে ওঠা ও বিএ পর্যন্ত লেখাপড়া সম্পন্ন করেন। এরপর এমএ পড়ার জন্য কলকাতা আসেন।
ছোটবেলা থেকেই সতীনাথ সংগীতানুরাগী ছিলেন ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ধ্রুপদ-ধামার-টপ্পা শেখেন। তার ঠাকুরদা রামচন্দ্র বেহালা বাজাতেন ও বাবা তারকচন্দ্র গান গাইতেন। তবে কেউ পেশাদারি ছিলেন না। কলকাতায় এসে পড়া বাদ দিয়ে সতীনাথ চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা করেন। কর্মজীবনে যোগদান করেন কলকাতার অ্যাকাউন্টেন্স জেনারেল (এজি বেঙ্গল) এ।

ব্যাক্তিগত জীবন

১৯৬৮ সালে সতীনাথ সংগীত শিল্পী উৎপলা সেন এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
জনপ্রিয় গানসমূহ
•    আকাশ এত মেঘলা
•    জীবনে যদি দ্বীপ
•    মরমীয়া তুমি
•    পাষানের বুকে
•    ও আকাশ প্রদীপ
•    জানি একদিন
•    তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি
•    কত না হাজার ফুল
•    হায় বরষা
•    এখনো আকাশ
•    বন্ধু হয় অনেকে

মৃত্যু

১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় পিজি হাসপাতালে বক্ষ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেন।

---------------------------------------------------------

Mukherjee satinatha
Wikipedia, the free encyclopedia
---------------------------------------------------------
Mukherjee satinatha
Birth     1925
Lucknow , Uttar Pradesh , British India
(Now India )
Death     13 Dec 199
Kolkata , India
Style     Modern, Nazrul geeti , Ghazal
Profession     Music Artists
--------------------------------------------

Satinatha Mukherjee (1925 - 13 December 199) was a renowned Bengali singer, lyricist and music director was. [1] The modern Bengali songs, Nazrul was known as a painter of music and song.

Early

    1 Early Life
    The Music practice
    3 Private Life
    4 Popular ganasamuha
    5 dead
    6 See also
    7 References
    8 References

Early life

Satinatha Mukherjee, India, in 1925 at Lucknow was born. Mukherjee tarakacandra his father. [ii] father was born in Lucknow cakarisutre chotabelatei moved satinatha Chinsura Hooghly . It grew up and completed his education at the BA. He came to Calcutta to study MA.

From an early age he was sangitanuragi satinatha and classical music, classical-Fawn-tappa learned. Ramchandra his grandfather played the violin and sang songs tarakacandra parents. However, no one was professionalism. Kolkata satinatha Chinmoy Lahiri, with the exception of the study of the classical music. During his career, he joined the Calcutta ayakauntensa General (AG Bengal) in.
Music practice
Personal life

In 1968, singer satinatha Utpala Sen was married to.
Popular ganasamuha

    The sky is so cloudy
    If island life
    You maramiya
    Pasanera Chest
    Lamp and sky
    I know one day
    You are ever so nice
    Full of how
    Oh barasa
    Yet the sky
    Many friends

Death

1992 PG Hospital in Kolkata on December 13, satinatha Mukherjee died in breast diseases.

Tuesday, March 10, 2015

দিনের প্রান্তে এসেছি


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দিনের প্রান্তে এসেছি
গোধূলির ঘাটে।
পথে পথে পাত্র ভরেছি
অনেক কিছু দিয়ে।
ভেবেছিলেম চিরপথের পাথেয় সেগুলি;
দাম দিয়েছি কঠিন দুঃখে।
অনেক করেছি সংগ্রহ মানুষের কথার হাটে,
কিছু করেছি সঞ্চয় প্রেমের সদাব্রতে।
শেষে ভুলেছি সার্থকতার কথা,
অকারণে কুড়িয়ে বেড়ানোই হয়েছে অন্ধ অভ্যাসে বাঁধা;
ফুটো ঝুলিটার শূন্য ভরাবার জন্যে
বিশ্রাম ছিল না।
আজ সামনে যখন দেখি
ফুরিয়ে এল পথ,
পাথেয়ের অর্থ আর রইল না কিছুই।
যে প্রদীপ জ্বলেছিল মিলন-শয্যার পাশে
সেই প্রদীপ এনেছিলেম হাতে ক'রে।
তার শিখা নিবল আজ,
সেটা ভাসিয়ে দিতে হবে স্রোতে।
সামনের আকাশে জ্বলবে একলা সন্ধ্যার তারা।
যে বাঁশি বাজিয়েছি
ভোরের আলোয় নিশীথের অন্ধকারে,
তার শেষ সুরটি বেজে থামবে
রাতের শেষ প্রহরে।
তার পরে?
যে জীবনে আলো নিবল
সুর থামল,
সে যে এই আজকের সমস্ত কিছুর মতোই
ভরা সত্য ছিল,
সে-কথা একেবারেই ভুলবে জানি,
ভোলাই ভালো।
তবু তার আগে কোনো একদিনের জন্য
কেউ একজন
সেই শূন্যটার কাছে একটা ফুল রেখো
বসন্তের যে ফুল একদিন বেসেছি ভালো
আমার এতদিনকার যাওয়া-আসার পথে
শুকনো পাতা ঝরেছে,
সেখানে মিলেছে আলোক ছায়া,
বৃষ্টিধারায় আমকাঁঠালের ডালে ডালে
জেগেছে শব্দের শিহরণ,
সেখানে দৈবে কারো সঙ্গে দেখা হয়েছিল
জল-ভরা ঘট নিয়ে যে চলে গিয়েছিল
চকিত পদে।
এই সামান্য ছবিটুকু
আর সব কিছু থেকে বেছে নিয়ে
কেউ একজন আপন ধ্যানের পটে এঁকো
কোনো একটি গোধূলির ধূসরমুহূর্তে।
আর বেশি কিছু নয়।
আমি আলোর প্রেমিক;
প্রাণরঙ্গভূমিতে ছিলুম বাঁশি-বাজিয়ে।
পিছনে ফেলে যাব না একটা নীরব ছায়া
দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে।
যে পথিক অস্তসূর্যের
ম্লায়মান আলোর পথ নিয়েছে
সে তো ধুলোর হাতে উজাড় করে দিলে
সমস্ত আপনার দাবি;
সেই ধুলোর উদাসীন বেদীটার সামনে
রেখে যেয়ো না তোমার নৈবেদ্য;
ফিরে নিয়ে যাও অন্নের থালি,
যেখানে তাকিয়ে আছে ক্ষুধা,
যেখানে অতিথি বসে আছে দ্বারে,
যেখানে প্রহরে প্রহরে বাজছে ঘন্টা
জীবনপ্রবাহের সঙ্গে কালপ্রবাহের

মিলের মাত্রা রেখে।

Friday, February 27, 2015

সিন্ধুপারে


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পউষ প্রখর শীতে জর্জর, ঝিল্লিমুখর রাতি;
নিদ্রিত পুরী, নির্জন ঘর, নির্বাণদীপ বাতি।
অকাতর দেহে আছিনু মগন সুখনিদ্রার ঘোরে--
তপ্ত শয্যা প্রিয়ার মতন সোহাগে ঘিরেছে মোরে।
হেনকালে হায় বাহির হইতে কে ডাকিল মোর নাম--
নিদ্রা টুটিয়া সহসা চকিতে চমকিয়া বসিলাম।
তীক্ষ্ণ শাণিত তীরের মতন মর্মে বাজিল স্বর--
ঘর্ম বহিল ললাট বাহিয়া, রোমাঞ্চকলেবর।
ফেলি আবরণ, ত্যজিয়া শয়ন, বিরলসন বেশে
দুরু দুরু বুকে খুলিয়া দুয়ার বাহিরে দাঁড়ানু এসে।
দূর নদীপারে শূন্য শ্মশানে শৃগাল উঠিল ডাকি,
মাথার উপরে কেঁদে উড়ে গেল কোন্ নিশাচর পাখি।
দেখিনু দুয়ারে রমণীমুরতি অবগুণ্ঠনে ঢাকা--
কৃষ্ণ অশ্বে বসিয়া রয়েছে, চিত্রে যেন সে আঁকা।
আরেক অশ্ব দাঁড়ায়ে রয়েছে, পুচ্ছ ভূতল চুমে,
ধূম্রবরন, যেন দেহ তার গঠিত শ্মশানধূমে।
নড়িল না কিছু, আমারে কেবল হেরিল আঁখির পাশে--
শিহরি শিহরি সর্ব শরীর কাঁপিয়া উঠিল ত্রাসে।
পাণ্ডু আকাশে খণ্ড চন্দ্র হিমানীর গ্লানি-মাখা,
পল্লবহীন বৃদ্ধ অশথ শিহরে নগ্ন শাখা।
নীরব রমণী অঙ্গুলী তুলি দিল ইঙ্গিত করি--
মন্ত্রমুগ্ধ অচেতনসম চড়িনু অশ্ব-'পরি।


বিদ্যুৎবেগে ছুটে যায় ঘোড়া-- বারেক চাহিনু পিছে,
ঘরদ্বার মোর বাষ্পসমান মনে হল সব মিছে।
কাতর রোদন জাগিয়া উঠিল সকল হৃদয় ব্যেপে,
কণ্ঠের কাছে সুকঠিন বলে কে তারে ধরিল চেপে।
পথের দুধারে রুদ্ধদুয়ারে দাঁড়ায়ে সৌধসারি,
ঘরে ঘরে হায় সুখশয্যায় ঘুমাইছে নরনারী।
নির্জন পথ চিত্রিতবৎ, সাড়া নাই সারা দেশে--
রাজার দুয়ারে দুইটি প্রহরী ঢুলিছে নিদ্রাবেশে।
শুধু থেকে থেকে ডাকিছে কুকুর সুদূর পথের মাঝে--
গম্ভীর স্বরে প্রাসাদশিখরে প্রহরঘন্টা বাজে।


অফুরান পথ, অফুরান রাতি, অজানা নূতন ঠাঁই--
অপরূপ এক স্বপ্নসমান, অর্থ কিছুই নাই।
কী যে দেখেছিনু মনে নাহি পড়ে, ছিল নাকো আগাগোড়া--
লক্ষ্যবিহীন তীরের মতন ছুটিয়া চলেছে ঘোড়া।
চরণে তাদের শব্দ বাজে না, উড়ে নাকো ধূলিরেখা--
কঠিন ভূতল নাই যেন কোথা, সকলি বাষ্পে লেখা।
মাঝে মাঝে যেন চেনা-চেনা-মতো মনে হয় থেকে থেকে--
নিমেষ ফেলিতে দেখিতে না পাই কোথা পথ যায় বেঁকে।
মনে হল মেঘ, মনে হল পাখি, মনে হল কিশলয়,
ভালো করে যেই দেখিবারে যাই মনে হল কিছু নয়।
দুই ধারে এ কি প্রাসাদের সারি? অথবা তরুর মূল?
অথবা এ শুধু আকাশ জুড়িয়া আমারই মনের ভুল?
মাঝে মাঝে চেয়ে দেখি রমণীর অবগুণ্ঠিত মুখে--
নীরব নিদয় বসিয়া রয়েছে, প্রাণ কেঁপে ওঠে বুকে।
ভয়ে ভুলে যাই দেবতার নাম, মুখে কথা নাহি ফুটে;
হুহু রবে বায়ু বাজে দুই কানে ঘোড়া চলে যায় ছুটে।


চন্দ্র যখন অস্তে নামিল তখনো রয়েছে রাতি,
পূর্ব দিকের অলস নয়নে মেলিছে রক্ত ভাতি।
জনহীন এক সিন্ধুপুলিনে অশ্ব থামিল আসি--
সমুখে দাঁড়ায়ে কৃষ্ণ শৈল গুহামুখ পরকাশি।
সাগরে না শুনি জলকলরব, না গাহে উষার পাখি,
বহিল না মৃদু প্রভাতপবন বনের গন্ধ মাখি।
অশ্ব হইতে নামিল রমণী, আমিও নামিনু নীচে,
আঁধার-ব্যাদান গুহার মাঝারে চলিনু তাহার পিছে।
ভিতরে খোদিত উদার প্রাসাদ শিলাস্তম্ভ-'পরে,
কনকশিকলে সোনার প্রদীপ দুলিতেছে থরে থরে।
ভিত্তির গায়ে পাষাণমূর্তি চিত্রিত আছে কত,
অপরূপ পাখি, অপরূপ নারী, লতাপাতা নানা-মতো।
মাঝখানে আছে চাঁদোয়া খাটানো, মুক্তা ঝালরে গাঁথা--
তারি তলে মণিপালঙ্ক-'পরে অমল শয়ন পাতা।
তারি দুই ধারে ধূপাধার হতে উঠিছে গন্ধধূপ,
সিংহবাহিনী নারীর প্রতিমা দুই পাশে অপরূপ।
নাহি কোনো লোক, নাহিকো প্রহরী, নাহি হেরি দাসদাসী।
গুহাগৃহতলে তিলেক শব্দ হয়ে উঠে রাশি রাশি।
নীরবে রমণী আবৃত বদনে বসিলা শয্যা-'পরে,
অঙ্গুলি তুলি ইঙ্গিত করি পাশে বসাইল মোরে।
হিম হয়ে এল সর্বশরীর, শিহরি উঠিল প্রাণ--
শোণিতপ্রবাহে ধ্বনিতে লাগিল ভয়ের ভীষণ তান।


সহসা বাজিয়া বাজিয়া উঠিল দশ দিকে বীণা-বেণু,
মাথার উপরে ঝরিয়া ঝরিয়া পড়িল পুষ্পরেণু।
দ্বিগুণ আভায় জ্বলিয়া উঠিল দীপের আলোকরাশি--
ঘোমটা-ভিতরে হাসিল রমণী মধুর উচ্চহাসি।
সে হাসি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া উঠিল বিজন বিপুল ঘরে--
শুনিয়া চমকি ব্যাকুল হৃদয়ে কহিলাম জোড়করে,
"আমি যে বিদেশী অতিথি, আমায় ব্যথিয়ো না পরিহাসে,
কে তুমি নিদয় নীরব ললনা, কোথায় আনিলে দাসে।'


অমনি রমণী কনকদণ্ড আঘাত করিল ভূমে,
আঁধার হইয়া গেল সে ভবন রাশি রাশি ধূপধূমে।
বাজিয়া উঠিল শতেক শঙ্খ হুলুকলরব-সাথে--
প্রবেশ করিল বৃদ্ধ বিপ্র ধান্যদূর্বা হাতে।
পশ্চাতে তার বাঁধি দুই সার কিরাতনারীর দল
কেহ বহে মালা, কেহ বা চামর, কেহ বা তীর্থজল।
নীরবে সকলে দাঁড়ায়ে রহিল-- বৃদ্ধ আসনে বসি
নীরবে গণনা করিতে লাগিল গৃহতলে খড়ি কষি।
আঁকিতে লাগিল কত না চক্র, কত না রেখার জাল,
গণনার শেষে কহিল "এখন হয়েছে লগ্ন-কাল'।
শয়ন ছাড়িয়া উঠিল রমণী বদন করিয়া নত,
আমিও উঠিয়া দাঁড়াইনু পাশে মন্ত্রচালিতমত।
নারীগণ সবে ঘেরিয়া দাঁড়ালো একটি কথা না বলি
দোঁহাকার মাথে ফুলদল-সাথে বরষি লাজাঞ্জলি।
পুরোহিত শুধু মন্ত্র পড়িল আশিস করিয়া দোঁহে--
কী ভাষা কী কথা কিছু না বুঝিনু, দাঁড়ায়ে রহিনু মোহে।
অজানিত বধূ নীরবে সঁপিল শিহরিয়া কলেবর
হিমের মতন মোর করে তার তপ্ত কোমল কর।
চলি গেল ধীরে বৃদ্ধ বিপ্র, পশ্চাতে বাঁধি সার
গেল নারীদল মাথায় কক্ষে মঙ্গল-উপচার।
শুধু এক সখী দেখাইল পথ হাতে লয়ে দীপখানি--
মোরা দোঁহে পিছে চলিনু তাহার, কারো মুখে নাহি বাণী।
কত না দীর্ঘ আঁধার কক্ষ সভয়ে হইয়া পার
সহসা দেখিনু সমুখে কোথায় খুলে গেল এক দ্বার।
কী দেখিনু ঘরে কেমনে কহিব, হয়ে যায় মনোভুল,
নানা বরনের আলোক সেথায়, নানা বরনের ফুল।
কনকে রজতে রতনে জড়িত বসন বিছানো কত,
মণিবেদিকায় কুসুমশয়ন স্বপ্নরচিত-মতো।
পাদপীঠ-'পরে চরণ প্রসারি শয়নে বসিলা বধূ--
আমি কহিলাম, "সব দেখিলাম, তোমারে দেখি নি শুধু।'


চারি দিক হতে বাজিয়া উঠিল শত কৌতুকহাসি।
শত ফোয়ারায় উছসিল যেন পরিহাস রাশি রাশি।
সুধীরে রমণী দু-বাহু তুলিয়া, অবগুণ্ঠনখানি
উঠায়ে ধরিয়া মধুর হাসিল মুখে না কহিয়া বাণী।
চকিত নয়ানে হেরি মুখপানে পড়িনু চরণতলে,
"এখানেও তুমি জীবনদেবতা!' কহিনু নয়নজলে।
সেই মধুমুখ, সেই মৃদুহাসি, সেই সুধাভরা আঁখি--
চিরদিন মোরে হাসালো কাঁদালো, চিরদিন দিল ফাঁকি।
খেলা করিয়াছে নিশিদিন মোর সব সুখে সব দুখে,
এ অজানাপুরে দেখা দিল পুন সেই পরিচিত মুখে।
অমল কোমল চরণকমলে চুমিনু বেদনাভরে--
বাধা না মানিয়া ব্যাকুল অশ্রু পড়িতে লাগিল ঝরে।
অপরূপ তানে ব্যথা দিয়ে প্রাণে বাজিতে লাগিল বাঁশি।

বিজন বিপুল ভবনে রমণী হাসিতে লাগিল হাসি।

Tuesday, February 17, 2015

সান্ত্বনা


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোথা হতে দুই চক্ষে ভরে নিয়ে এলে জল

     হে প্রিয় আমার।
হে ব্যথিত, হে অশান্ত, বলো আজি গাব গান
     কোন্ সান্ত্বনার।
  হেথায় প্রান্তরপারে
  নগরীর এক ধারে
  সায়াহ্নের অন্ধকারে
     জ্বালি দীপখানি
  শূন্য গৃহে অন্যমনে
  একাকিনী বাতায়নে
  বসে আছি পুষ্পাসনে
     বাসরের রানী--
কোথা বক্ষে বিঁধি কাঁটা ফিরিলে আপন নীড়ে
     হে আমার পাখি।
ওরে ক্লিষ্ট, ওরে ক্লান্ত, কোথা তোর বাজে ব্যথা,
     কোথা তোরে রাখি।


চারি দিকে তমস্বিনী রজনী দিয়েছে টানি
    মায়ামন্ত্র-ঘের--
দুয়ার রেখেছি রুধি, চেয়ে দেখো কিছু হেথা
    নাহি বাহিরের।
  এ যে দুজনের দেশ,
  নিখিলের সব শেষ,
  মিলনের রসাবেশ
    অনন্ত ভবন--
  শুধু এই এক ঘরে
  দুখানি হৃদয় ধরে,
  দুজনে সৃজন করে
    নূতন ভুবন।
একটি প্রদীপ শুধু এ আঁধারে যতটুকু
    আলো করে রাখে
সেই আমাদের বিশ্ব, তাহার বাহিরে আর
    চিনি না কাহাকে।


একখানি বীণা আছে, কভু বাজে মোর বুকে
    কভু তব কোরে।
একটি রেখেছি মালা, তোমারে পরায়ে দিলে
    তুমি দিবে মোরে।
  এক শয্যা রাজধানী,
  আধেক আঁচলখানি
  বক্ষ হতে লয়ে টানি
    পাতিব শয়ন।
  একটি চুম্বন গড়ি
  দোঁহে লব ভাগ করি--
  এ রাজত্বে, মরি মরি,
    এত আয়োজন।
একটি গোলাপফুল রেখেছি বক্ষের মাঝে,
    তব ঘ্রাণশেষে
আমারে ফিরায়ে দিলে অধরে পরশি তাহা
    পরি লব কেশে।


আজ করেছিনু মনে তোমারে করিব রাজা
    এই রাজ্যপাটে,
এ অমর বরমাল্য আপনি যতনে তব
    জড়াব ললাটে।
  মঙ্গলপ্রদীপ ধ'রে
  লইব বরণ করে,
  পুষ্পসিংহাসন-'পরে
      বসাব তোমায়--
  তাই গাঁথিয়াছি হার,
  আনিয়াছি ফুলভার,
  দিয়েছি নূতন তার
      কনকবীণায়।
আকাশে নক্ষত্রসভা নীরবে বসিয়া আছে
      শান্ত কৌতূহলে--
আজি কি এ মালাখানি সিক্ত হবে, হে রাজন্,
      নয়নের জলে।


রুদ্ধকণ্ঠ, গীতহারা, কহিয়ো না কোনো কথা,
      কিছু শুধাব না--
নীরবে লইব প্রাণে তোমার হৃদয় হতে
      নীরব বেদনা।
  প্রদীপ নিবায়ে দিব,
  বক্ষে মাথা তুলি নিব,
  স্নিগ্ধ করে পরশিব
      সজল কপোল--
  বেণীমুক্ত কেশজাল
  স্পর্শিবে তাপিত ভাল,
  কোমল বক্ষের তাল
      মৃদুমন্দ দোল।
নিশ্বাসবীজনে মোর কাঁপিবে কুন্তল তব,
      মুদিবে নয়ন--
অর্ধরাতে শান্তবায়ে নিদ্রিত ললাটে দিব

      একটি চুম্বন।

Monday, February 16, 2015

অবেলার ডাক

- কাজী নজরুল ইসলাম

অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে,
      আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।।
      আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে,
     চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্‌তে আঘাত ভোরের ঘুমে।
                  ভাব্‌তুম তখন এ কোন্ বালাই!
                   কর্ত এ প্রাণ পালাই পালাই।
      আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে।
     অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।।
     তরুণ তাহার ভরাট বুকের উপ্চে-পড়া আদর সোহাগ
   হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ?
                     এই চরণ সে বক্ষে চেপে
                    চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে
       জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে,
     এম্‌নি দারুণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।।
   দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা,
      দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা।
                    ভেবেছিলাম আমার কাছে
                    তার দরদের শানি- আছে,
   আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্‌তে নেরে দেবতারে।
       ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।।
   পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী,
    মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্‌তে পারি?
                  তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা
                    নিইনি, নিইনি মণির মালা,
   দেব্‌তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে।
     পূজারীকে চিন্‌লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।।
আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি?
       ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী।
                     ওরে আমার ভালোবাসা!
                      কোথায় বেঁধেছিলি বাসা
       যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে?
   নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’
     সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া?
       দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া।
                     মাঠের পারে বনের মাঝে
                     চপল তাহার নূপুর বাজে,
   ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে,
    ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে?
   মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার?
    তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার।
                   তাই মা আমার বুকের কবাট
                   খুলতে নারল তার করাঘাত,
    এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে,
      আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।।
     সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে,
     হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্ত কেঁপে।
                    রাজ ভিখারীর আঁখির কালো,
                    দূরে থেকেই লাগ্ত ভালো,
   আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে।
  ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।।
   আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা
   চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা,
                   আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে
                    এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে
  গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে!
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে?
   আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম
  চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম।
                  হে বসনে-র রাজা আমার!
               নাও এসে মোর হার-মানা-হারা!
   আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে,
দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে!
    তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে,
     দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে।
                    জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার,
                    ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার
    মূকের বুকে দেব্‌তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে।
    বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্ছ কারে?
     স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে,
  এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে।
                   ঘুম ভাঙাতে আস্‌বে না সে
                 ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে,
     আস্‌বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে,
    কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।
  আজ পেলে তাঁয় হুম্‌ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে,
    বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে।
                  ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল,
                  সজল চোখের চোখ-ভরা জল-
    ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে,
    আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।
    দেখ্‌তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী,
   মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’
                    ব’ল্‌তে গিয়ে সুখ-শরমে
                  লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে,
  বুক হ’তে মুখ আস্ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে,
দেখ্‌তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্‌তে পারে!
    এম্‌নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে
    তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে।
                   চোখের জলের ঋণী ক’রে,
                   সে গেছে কোন্ দ্বীপান-রে?
     সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে?
  ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে?
    তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর,
  চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর।
                 চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে
                  ধরার সাগর অশ্রু ছেপে,
     উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে,
  ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে।
  ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে?
তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে!
                শুনতে শুনতে তোমার কোলে
                 ঘুমিয়ে পড়ি। - ও কে খোলে
   দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে?
ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে!
   সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে,
  যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে!
                    তবু কেন থাকি’ থাকি’,
                    ইচ্ছা করে তারেই ডাকি!
   যে কথা মোর রইল বাকী হায় সে কথা শুনাই কারে?
  মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!
   যাই তবে মা! দেখা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে-
   রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে?
                   মাগো আমি জানি জানি,
                   আসবে আবার অভিমানী
  খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে,

    ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি   বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে।
      আজি   খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,
      আজি   ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,
      এই    সংগীতমুখরিত গগনে
      তব    গন্ধ করঙ্গিয়া তুলিয়ো।
      এই    বাহিরভূবনে দিশা হারায়ে
      দিয়ো   ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।

অতি   নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে
আজি   পল্লবে পল্লবে বাজে রে -
দূরে   গগনে কাহার পথ চাহিয়া
আজি ব্যকুল বসুন্ধরা সাজে রে।
      মোর   পরানে দখিন বায়ু লাগিছে,
      কারে   দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,
      এই    সৌরভবিহবল রজনী
      কার   চরণে ধরণীতলে জাগিছে।
      ওগো   সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,
      তব   গম্ভীর আহবান কারে।



বোলপুর
২৬ চৈত্র ১৩১৬

কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি

রচনা সংখ্যাঃ ৫৫

Thursday, February 12, 2015

তৃতীয় সর্গ


- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কত দেশ দেশান্তরে ভ্রমিল সে কবি!
তুষারস্তম্ভিত গিরি করিল লঙ্ঘন,
সুতীক্ষ্নকণ্টকময় অরণ্যের বুক
মাড়াইয়া গেল চলি রক্তময় পদে।
কিন্তু বিহঙ্গের গান, নির্ঝরের ধ্বনি,
পারে না জুড়াতে আর কবির হৃদয়।
বিহগ, নির্ঝর-ধ্বনি প্রকৃতির গীত--
মনের যে ভাগে তার প্রতিধ্বনি হয়
সে মনের তন্ত্রী যেন হোয়েছে বিকল।
একাকী যাহাই আগে দেখিত সে কবি
তাহাই লাগিত তার কেমন সুন্দর,
এখন কবির সেই একি হোলো দশা--
যে প্রকৃতি-শোভা-মাঝে নলিনী না থাকে
ঠেকে তা শূন্যের মত কবির নয়নে,
নাইক দেবতা যেন মন্দিরমাঝারে।
বালার মুখের জ্যোতি করিত বর্দ্ধন
প্রকৃতির রূপচ্ছটা দ্বিগুণ করিয়া;
সে না হোলে অমবস্যানিশির মতন
সমস্ত জগৎ হোত বিষণ্ণ আঁধার।
                --
জ্যোৎস্নায় নিমগ্ন ধরা, নীরব রজনী।
অরণ্যের অন্ধকারময় গাছগুলি
মাথার উপরে মাখি রজত জোছনা,
শাখায় শাখায় ঘন করি জড়াজড়ি,
কেমন গম্ভীরভাবে রোয়েছে দাঁড়ায়ে।
হেথায় ঝোপের মাঝে প্রচ্ছন্ন আঁধার,
হোথায় সরসীবক্ষে প্রশান্ত জোছনা।
নভপ্রতিবিম্বশোভী ঘুমন্ত সরসী
চন্দ্র তারকার স্বপ্ন দেখিতেছে যেন!
লীলাময় প্রবাহিণী চলেছে ছুটিয়া,
লীলাভঙ্গ বুকে তার পাদপের ছায়া
ভেঙ্গে চুরে কত শত ধরিছে মূরতি।
গাইছে রজনী কিবা নীরব সঙ্গীত!
কেমন নীরব বন নিস্তব্ধ গম্ভীর--
শুধু দূর-শৃঙ্গ হোতে ঝরিছে নির্ঝর,
শুধু একপাশ দিয়া সঙ্কুচিত অতি
তটিনীটি সর সর যেতেছে চলিয়া।
অধীর বসন্তবায়ু মাঝে মাঝে শুধু
ঝরঝরি কাঁপাইছে গাছের পল্লব।
এহেন নিস্তব্ধ রাত্রে কত বার আমি
গম্ভীর অরণ্যে একা কোরেছি ভ্রমণ।
স্নিগ্ধ রাত্রে গাছপালা ঝিমাইছে যেন,
ছায়া তার পোড়ে আছে হেথায় হোথায়।
দেখিয়াছি নীরবতা যত কথা কয়
প্রাণের মরম-তলে, এত কেহ নয়।
দেখি যবে অতি শান্ত জোছনায় মজি
নীরবে সমস্ত ধরা রয়েছে ঘুমায়ে,
নীরবে পরশে দেহ বসন্তের বায়,
জানি না কি এক ভাবে প্রাণের ভিতর
উচ্ছ্বসিয়া উথলিয়া উঠে গো কেমন!
কি যেন হারায়ে গেছে খুঁজিয়া না পাই,
কি কথা ভুলিয়া যেন গিয়েছি সহসা,
বলা হয় নাই যেন প্রাণের কি কথা,
প্রকাশ করিতে গিয়া পাই না তা খুঁজি!
কে আছে এমন যার এ হেন নিশীথে,
পুরাণো সুখের স্মৃতি উঠে নি উথলি!
কে আছে এমন যার জীবনের পথে
এমন একটি সুখ যায় নি হারায়ে,
যে হারা-সুখের তরে দিবা নিশি তার
হৃদয়ের এক দিক শূন্য হোয়ে আছে।
এমন নীরব-রাত্রে সে কি গো কখনো
ফেলে নাই মর্ম্মভেদী একটি নিশ্বাস?
কর স্থানে আজ রাত্রে নিশীথপ্রদীপে
উঠিছে প্রমোদধ্বনি বিলাসীর গৃহে।
মুহূর্ত্ত ভাবে নি তারা আজ নিশীথেই
কত চিত্ত পুড়িতেছে প্রচ্ছন্ন অনলে।
কত শত হতভাগা আজ নিশীথেই
হারায়ে জন্মের মত জীবনের সুখ
মর্ম্মভেদী যন্ত্রণায় হইয়া অধীর
একেলাই হা হা করি বেড়ায় ভ্রমিয়া!
               --
ঝোপে-ঝাপে ঢাকা ওই অরণ্যকুটীর।
বিষণ্ণ নলিনীবালা শূন্য নেত্র মেলি
চাঁদের মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া!
জানি না কেমন কোরে বালার বুকের মাঝে
সহসা কেমন ধারা লেগেছে আঘাত--
আর সে গায় না গান, বসন্ত ঋতুর অন্তে
পাপিয়ার কণ্ঠ যেন হোয়েছে নীরব।
আর সে লইয়া বীণা বাজায় না ধীরে ধীরে,
আর সে ভ্রমে না বালা কাননে কাননে।
বিজন কুটীরে শুধু মরণশয্যার 'পরে
একেলা আপন মনে রয়েছে শুইয়া।
যে বালা মুহূর্ত্তকাল স্থির না থাকিত কভু,
শিখরে নির্ঝরে বনে করিত ভ্রমণ--
কখনো তুলিত ফুল, কখনো গাঁথিত মালা,
কখনো গাইত গান, বাজাইত বীণা--
সে আজ এমন শান্ত, এমন নীরব স্থির!
এমন বিষণ্ণ শীর্ণ সে প্রফুল্ল মুখ!
এক দিন, দুই দিন, যেতেছে কাটিয়া ক্রমে--
মরণের পদশব্দ গণিছে সে যেন!
আর কোন সাধ নাই, বাসনা রয়েছে শুধু
কবিরে দেখিয়া যেন হয় গো মরণ।
এ দিকে পৃথিবী ভ্রমি সহিয়া ঝটিকা কত
ফিরিয়া আসিছে কবি কুটীরের পানে,
মধ্যাহ্নের রৌদ্রে যথা জ্বলিয়া পুড়িয়া পাখী
সন্ধ্যায় কুলায়ে তার আইসে ফিরিয়া।
বহুদিন পরে কবি পদার্পিল বনভূমে,
বৃক্ষলতা সবি তার পরিচিত সখা!
তেমনি সকলি আছে, তেমনি গাইছে পাখী,
তেমনি বহিছে বায়ু ঝর ঝর করি।
অধীরে চলিল কবি কুটীরের পানে--
দুয়ারের কাছে গিয়া দুয়ারে আঘাত দিয়া
ডাকিল অধীর স্বরে, নলিনী! নলিনী!
কিছু নাই সাড়া শব্দ, দিল না উত্তর কেহ,
প্রতিধ্বনি শুধু তারে করিল বিদ্রূপ।
কুটীরে কেহই নাই, শূন্য তা রয়েছে পড়ি--
বেষ্টিত বিতন্ত্রী বীণা লূতাতন্তুজালে।
ভ্রমিল আকুল কবি কাননে কাননে,
ডাকিয়া সমুচ্চ স্বরে, নলিনী! নলিনী!
মিলিয়া কবির স্বরে বনদেবী উচ্চস্বরে
ডাকিল কাতরে আহা, নলিনী! নলিনী!
কেহই দিল না সাড়া, শুধু সে শব্দ শুনি
সুপ্ত হরিণেরা ত্রস্ত উঠিল জাগিয়া।
অবশেষে গিরিশৃঙ্গে উঠিল কাতর কবি,
নলিনীর সাথে যেথা থাকিত বসিয়া।
দেখিল সে গিরি-শৃঙ্গে, শীতল তুষার-'পরে,
নলিনী ঘুমায়ে আছে ম্লানমুখচ্ছবি।
কঠোর তুষারে তার এলায়ে পড়েছে কেশ,
খসিয়া পড়েছে পাশে শিথিল আঁচল।
বিশাল নয়ন তার অর্দ্ধনিমীলিত,
হাত দুটি ঢাকা আছে অনাবৃত বুকে।
একটি হরিণশিশু খেলা করিবার তরে
কভু বা অঞ্চল ধরি টানিতেছে তার,
কভু শৃঙ্গ দুটি দিয়া সুধীরে দিতেছে ঠেলি,
কভু বা অবাক্ নেত্রে রহিছে চাহিয়া!
তবু নলিনীর ঘুম কিছুতেই ভাঙ্গিছে না,
নীরবে নিস্পন্দ হোয়ে রয়েছে ভূতলে।
দূর হোতে কবি তারে দেখিয়া কহিল উচ্চে,
"নলিনী, এয়েছি আমি দেখ্সে বালিকা।"
তবুও নলিনী বালা না দিয়া উত্তর
শীতল তুষার-'পরে রহিল ঘুমায়ে।
কবি সে শিখর-'পরে করি আরোহণ
শীতল অধর তার করিল চুম্বন--
শিহরিয়া চমকিয়া দেখিল সে কবি
না নড়ে হৃদয় তার, না পড়ে নিশ্বাস।
দেখিল না, ভাবিল না, কহিল না কিছু,
যেমন চাহিয়া ছিল রহিল চাহিয়া।
নিদারুণ কি যেন কি দেখিছে তরাসে
নয়ন হইয়া গেল অচল পাষাণ।
কতক্ষণে কবি তবে পাইল চেতন,
দেখিল তুষারশুভ্র নলিনীর দেহ
হৃদয়জীবনহীন জড় দেহ তার
অনুপম সৌন্দর্য্যের কুসুম-আলয়,
হৃদয়ের মরমের আদরের ধন--
তৃণ কাষ্ঠ সম ভূমে যায় গড়াগড়ি!
বুকে তারে তুলে লয়ে ডাকিল "নলিনী",
হৃদয়ে রাখিয়া তারে পাগলের মত কবি
কহিল কাতর স্বরে "নলিনী" "নলিনী"!
স্পন্দহীন, রক্তহীন অধর তাহার
অধীর হইয়া ঘন করিল চুম্বন।
               --
তার পর দিন হোতে সে বনে কবিরে আর
পেলে না দেখিতে কেহ, গেছে সে কোথায়!
ঢাকিল নলিনীদেহ তুষারসমাধি--
ক্রমে সে কুটীরখানি কোথা ভেঙ্গে চুরে গেল,
ক্রমে সে কানন হোলো গ্রাম লোকালয়,
সে কাননে--কবির সে সাধের কাননে

অতীতের পদচিহ্ন রহিল না আর।